

মোঃ মারুফ হোসেন লিয়নঃ নীলফামারীর বিহারি অধ্যুষিত সৈয়দপুর শহরে দিনব্যাপী নানা আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে পবিত্র আশুরা। শিয়া ও সুন্নী উভয় মতের অনুসারিরা শান্তিপূর্ণভাবে দিনটি পালন করেন। এর আনুষ্ঠানিকতার জন্য সারা দেশে নীলফমারীর সৈয়দপুরের নাম ছড়িয়ে পড়েছে। যা দেখার জন্য আশপাশের জেলা শহর থেকেও মানুষজন আসেন এখানে।
জানা গেছে, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম তাজিয়া মিছিল বের হয় সৈয়দপুর শহরে। তাজিয়া মিছিলের পাশাপাশি আশুরা উপলক্ষে শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ঐতিহ্যবাহী লাঠি খেলা, তলোয়ার ও আগুনের বিভিন্ন ধরনের খেলা হয়। সবার মুখে উচ্চারিত হয় ইয়া হোসেন, ইয়া হোসেন। প্রতিটি ইমামবাড়ায় তাজিয়া মিছিল, লাঠি খেলা, ইমাম হোসেনের ঘোড়ার প্রতিকৃতি হিসেবে মানত করে পাইকবাধা, ইমামবাড়ায় ফাতেহা পাঠ, নিশান চড়ানো হয়ে থাকে।
আজ (৬ জুলাই)রবিবার বিকালে সুন্নি ও শিয়া সম্প্রদায়ের লোকেরা শহরের কাজির হাট ঈদগাহ মাঠ থেকে শোভাযাত্রা ও মিছিল বের করে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে হাতিখানা কবরস্থানে প্রতীকী কারবালায় জড়ো হন। ঢোলের তালে তালে দুইহাত দিয়ে সজোরে বুকে আঘাত করেন আর মুখে উচ্চারিত হয় ইয়া হোসেন, ইয়া হোসেন। কেউবা অঝোড় নয়নে কাঁদেন আর ইমাম হোসেনের মৃত্যর স্মরণে মাতম গীত গাইতে থাকেন।
মহররম কমিটির অন্যতম শাহিদ চিশতী সৈয়দপুরের আলো কে জানান, বিশ্বনবী (সাঃ) দৌহিত্র ইমাম হোসাইনের মহব্বতে এ পাইকওয়ালারা তিন দিন ইমাম হোসেনের প্রতিকী দুলদুল সেজে মানত করে থাকেন। চাঁদ ওঠার সাথে সাথে এ প্রতিকী কারবালার মাটি নিয়ে প্রতি ইমামবাড়ায় দেওয়া হয়। আজ এ কারবালায় এসে পাইক খুলে ও নিয়ে যাওয়া মাটি ফেরত এনে এর আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়। মহররম উদ্যাপনে ব্যতিক্রম সৈয়দপুরে বিভিন্ন মহল্লার প্রতিটি ইমামবাড়ায় তাজিয়া বানানো হয়। আলোকসজ্জার পাশাপাশি তালে তালে বাজানো হয় ঢোল। আর এই ঢোলের শব্দে রাতের সৈয়দপুরে বিরাজ করে এক নির্ঘুম আবহ। সুন্নী সম্প্রদায়ের একটি অংশ এভাবে শহরের বিভিন্নস্থানে নির্মাণ করেন বড় বড় তোরণ। ঈমামবাড়াগুলোতে ইমাম হোসেনের মাজারকে স্মরণ করে তৈরি করা হয় তাজিয়া। সেখানে মানতের পাশাপাশি চলে ফাতেহা পাঠ।
শহরের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোয় চলছে ঐতিহ্যবাহী লাঠি খেলা, তলোয়ার ও আগুনের বিভিন্ন ধরনের খেলা। একই সঙ্গে মুখে উচ্চারিত হয় ‘ইয়া হোসেন, ইয়া হোসেন’। কেউবা অঝোর নয়নে কাঁদেন আর ইমাম হোসেনের স্মরণে মাতম গীত গেয়ে থাকেন। প্রতি ইমামবাড়ায় সারারাত ঢোল বাজনা, তাজিয়া মিছিল, লাঠি খেলা, ইমাম হোসেনের ঘোড়ার প্রতিকৃতি হিসাবে মানত করে পাইকবাধা, ইমামবাড়ায় ফাতেহা পাঠ, নিশান চড়ানো হয়ে থাকে। আরবি মাসের ৯ তারিখে রাত ১১ টার দিকে ইমামবাড়ায় বসানো হয় তাজিয়া। এবং মহররম মাসের ১০ তারিখ পর্যন্ত দলবেধে প্রত্যেক ইমামবাড়ায় ইয়া হোসাইন ইয়া হোসাইন বলে কাসিদা পাঠ করেন থাকেন পাইকওয়ালারা। শহরের অনেক জায়গায় বসে মেলা আবার বিভিন্ন পাড়া মহল্লায় কাসিদা পাঠের জন্য ঝর্না আসরও বসে। সব মিলে মহররম মাসের আনুষ্ঠানিকতা পালনে সৈয়দপুর পেয়ে আসছে এক আলাদা পরিচিতি। এবং এসব আনুষ্ঠানিকতা দেখতে আশপাশের শহর থেকে প্রতি বছর ছুটে আসেন প্রচুর মানুষ।
ইমামবাড়ায় মানত করতে দলবেধে আসা মানুষদের মধ্যে অনেক হিন্দুকেও মানত করে ইমামবাড়ায় ফাতেহা দিতে দেখা যায় যা অসম্প্রদায়িকতার এক নিদর্শন বহন করে বটে। শহরের রসুলপুর ইমামবাড়ায় ফাতেহা দিতে আসা অমুসলিম গীতা রানী বলেন, ইমাম হোসেনের আদর্শ আমরাও লালন করি, উনাকে মানি, মূলত তিনি সবার। তাই প্রতি বছর এখানে ইমাম হোসেনের নামে ফাতেহা দিতে আসি।
সৈয়দপুর থানার ওসি ফইম উদ্দিন সৈয়দপুরের আলো কে জানান, অবাঙ্গালি অধ্যুষিত এলাকা হলেও এখানে সাম্প্রদায়িক কোনও সংঘাত নেই। ফলে শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হয়েছে পবিত্র আশুরা। নিরাপত্তার জন্য পুলিশের টহল-ভ্যান ঘুরছে। পুরো কারবালার মাঠকে নিরাত্তার চাদরে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল । পাশাপাাশি শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে মোতায়েন থাকেন পুলিশ। পুলিশের পাশাপাশি র্যাব-১৩ এর পক্ষ থেকে টহল ব্যবস্থা করা হয় জোরদার করা হয় । সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের তল্লাশি করা হচ্ছে। ফলে এবারে আশুরায় কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
আপনার মতামত লিখুন :