

সৈয়দপুরের আলোঃ কোনো পেশাই ছোট নয় পরিশ্রম, পরিকল্পনা আর ধৈর্য থাকলে যে কোনো কাজ থেকেই আসতে পারে সাফল্য। সেই কথার বাস্তব উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন নীলফামারীর সৈয়দপুরে ভেড়া পালন করে বাণিজ্যিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া মাওলানা সাজিদুল লোহানী।
মূলত সখের বসে শুরু হলেও সময়ের ব্যবধানে ভেড়া পালনই হয়ে উঠেছে তাঁর জীবনের প্রধান আয়ের উৎস। বদরগঞ্জ উপজেলার লোহানীপাড়া গ্রামের সন্তান হলেও দীর্ঘদিন ধরে তিনি সৈয়দপুর শহরের বাঙালিপুর নিজপাড়ায় পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন।
সাজিদুল লোহানী জানান, ছোটবেলা থেকেই তিনি দারুল উলুম মাদরাসার জমিতে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস করে আসছেন। ২০০০ সালে মাওলানা পাশ করার পর এক বছর বেকার জীবন কাটাতে হয় তাঁকে। ২০০২ সালে ওষুধের ব্যবসা শুরু করলেও দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও কাঙ্ক্ষিত লাভের মুখ দেখেননি। পরে মাদরাসার জমির ওপর একটি টিনের ঘর নির্মাণ করে নতুনভাবে স্বপ্ন দেখেন।
২০১৯ সালে একেবারে প্রাথমিকভাবে মাত্র ৪টি ভেড়া, ৩টি ছাগল ও ৫টি চিনা হাঁস দিয়ে শুরু করেন খামার কার্যক্রম। শুরুটা ছিল নিছক শখের বশে। কিন্তু ভেড়াগুলো পাঁচ-ছয় মাস পরপর বাচ্চা দেওয়ায় অল্প সময়েই খামার ভরে ওঠে।
বর্তমানে তাঁর খামারে রয়েছে প্রায় ১০০টি ভেড়া, ৫০টি ছাগল ও ১০০টি চিনা হাঁস। বাজারে বড় ভেড়ার দাম গড়ে ১০ হাজার টাকা, বড় ছাগল ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা এবং চিনা হাঁসের জোড়া বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৩ হাজার টাকায়।
তিনি বলেন, “গত দুই বছর ধরে নিয়মিত বিক্রি শুরু করেছি। সব খরচ বাদ দিয়ে বছরে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকার বেশি লাভ হচ্ছে। সঠিক পরিচর্যা করতে পারলে সামনে এই আয় ৬–৭ লাখ টাকায় পৌঁছানো সম্ভব।”
খামারের ব্যয় প্রসঙ্গে তিনি জানান, প্রতিটি ভেড়া ও ছাগলের পেছনে দৈনিক গড়ে ২০ টাকা খরচ হয়। সে হিসেবে ১৫০টি ভেড়া ও ছাগলের জন্য মাসিক ব্যয় প্রায় ৯০ হাজার টাকা, আর বছরে মোট খরচ দাঁড়ায় প্রায় ১০ লাখ ৮০ হাজার টাকা।
তিনি আরও বলেন, “এই মুহূর্তে যদি সব ভেড়া ও ছাগল গড়ে ১০ হাজার টাকা করে বিক্রি করা হয়, তাহলে মোট মূল্য দাঁড়াবে প্রায় ১৫ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে ক্রয়মূল্য, ঘরভাড়া, বিদ্যুৎ বিল ও শ্রমিক খরচ বাদ দিয়ে নিট লাভ থাকে ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা।”
ভালো জাতের ভেড়া ও ছাগল হওয়ায় দূর-দূরান্ত থেকে ক্রেতারা তাঁর খামারে আসছেন। তাঁর সাফল্য দেখে ইতোমধ্যে ৫–৬ জন যুবক ভেড়া পালনের ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন বলেও জানান তিনি।
সরকারি সহায়তার বিষয়ে সাজিদুল লোহানী বলেন, “যদি সরকারিভাবে মোটা অঙ্কের ঋণ বা প্রণোদনা পাওয়া যায়, তাহলে বড় পরিসরে খামার গড়ে তুলে শিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত যুবকদের কর্মসংস্থান করা সম্ভব। এতে বেকারত্ব কমবে, বাড়বে রাজস্ব দেশ হবে স্বাবলম্বী।তিনি শিক্ষিত বেকার যুবকদের ভেড়া পালনের দিকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে সরকারকে এককালীন অর্থ সহায়তার উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ জানান।
এ বিষয়ে সৈয়দপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের ভ্যাটেরিনারি সার্জন ডা. আবদুর রাজ্জাক বলেন,“ভেড়া ও ছাগল পালন অত্যন্ত লাভজনক একটি খাত। অল্প পুঁজিতেই শুরু করা যায় এবং ঝুঁকিও কম। চাকরির পেছনে না ছুটে শিক্ষিত যুবকরা যদি এই খাতে আসেন, তাহলে অল্প সময়েই সফলতা অর্জন সম্ভব।”
ভেড়া পালন করে মাওলানা সাজিদুল লোহানীর এই সাফল্য এখন এলাকার বেকার যুবকদের জন্য হয়ে উঠেছে অনুপ্রেরণার গল্প যা প্রমাণ করে, সঠিক উদ্যোগ আর পরিশ্রম থাকলে গ্রাম থেকেই গড়ে তোলা যায় স্বপ্নের ভবিষ্যৎ।
আপনার মতামত লিখুন :