মোঃ মারুফ হোসেন লিয়নঃ মধ্য পৌষ। উত্তরের জেলা নীলফামারীতে শীত যেন প্রতিদিনই নতুন করে ভয় ধরাচ্ছে। সূর্যের দেখা নেই দিনের পর দিন। ঘন কুয়াশা আর কনকনে ঠান্ডায় সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত জনপথ প্রায় ফাঁকা। প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছে না। এই তীব্র শীতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন দিনমজুর ও খেটে খাওয়া মানুষরা। তাদের মধ্যেই অন্যতম নরসুন্দর বা নাপিত পেশায় নিয়োজিত শ্রমজীবীরা।
গত কয়েকদিন ধরে নীলফামারীতে তাপমাত্রা ১২ থেকে ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে।আবহাওয়ার এই পরিস্থিতিতে জেলার ছয় উপজেলার অন্তত চার হাজার নরসুন্দর কর্মী কার্যত কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। দোকান খুলে বসে থাকলেও খদ্দের নেই, আয় নেই সংসার চলছে অনিশ্চয়তার ওপর।
শীত এলেই বন্ধ হয়ে যায় জীবিকা জেলার ছয়টি উপজেলা মিলিয়ে বর্তমানে পাঁচ শতাধিক সেলুন দোকান রয়েছে। প্রতিটি দোকানে মালিকসহ গড়ে ৬ থেকে ১০ জন নরসুন্দর কর্মী কাজ করেন। হিসাব অনুযায়ী, পুরো জেলায় প্রায় চার হাজার মানুষ সরাসরি এই পেশার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু শীত এলেই এই পেশায় নেমে আসে স্থবিরতা।
সৈয়দপুর শহরের বাণিজ্যিক এলাকায় অবস্থিত সৌখিন হেয়ার কাটিং সেলুনের মালিক ও নরসুন্দর কল্যাণ সমিতির সাবেক নেতা রঞ্জিত ঠাকুর বলেন,“আমাদের পেশাটা পুরোপুরি মৌসুমনির্ভর। শীতকাল মানেই কাজ বন্ধ। খুব জরুরি না হলে কেউ চুল-দাড়ি কাটতে আসে না। পানির ব্যবহার ছাড়া ক্ষৌরকাজ সম্ভব নয়, কিন্তু এই ঠান্ডায় মানুষ সেটাই এড়িয়ে চলে।
তিনি আরও বলেন,“চুল বা দাড়ি কাটার পর গোসল করতে হয় এটাই বাস্তবতা। অথচ শীতের সময় মানুষ দুই-তিন দিন পরপর গোসল করে। ফলে শীতের তিন মাস আমরা বেকার হয়ে পড়ি।
সৈয়দপুর রেলওয়ে কলোনি এলাকার নরসুন্দর কর্মী আব্দুল মালেক বলেন,“ভোরে দোকান খুলে বসি, সন্ধ্যা হয়ে যায় খদ্দের আসে না। সারাদিনে আয় হয় ৫০ টাকাও না। সংসারে পাঁচজন মানুষ, কীভাবে চলবো বুঝতে পারছি না।
একই এলাকার আরেক নরসুন্দর সঞ্জয় রায় বলেন,“আমাদের কোনো সঞ্চয় নেই। কাজ না থাকলে না খেয়ে থাকতে হয়। শীত এলেই ধারদেনা করে সংসার চালাতে হয়। দোকান ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল সবই বকেয়া পড়ে যাচ্ছে।
কিশোরগঞ্জ উপজেলার নরসুন্দর কর্মী মোস্তাফিজুর রহমান জানান,“গ্রামে শীতের সময় মানুষ আরও বেশি চুল-দাড়ি কাটে না। সপ্তাহে একদিনও কাজ হয় না। অনেকেই বাধ্য হয়ে অন্যের জমিতে দিনমজুরি করছে, কেউ কেউ রিকশা চালাচ্ছে।
ডোমার উপজেলার নরসুন্দর হরিপদ দাস বলেন,“আমাদের পেশার মানুষগুলো সমাজে সবচেয়ে অবহেলিত। শীতের সময় কেউ আমাদের খোঁজ নেয় না। অথচ পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রামটা সবচেয়ে কঠিন হয় এই সময়েই।
নরসুন্দর মালিক ও কর্মীরা বলছেন, এই পেশার মানুষরা বছরের একটি নির্দিষ্ট সময় পুরোপুরি কর্মহীন থাকেন। তাই তাদের জন্য বিশেষ সহায়তা জরুরি।
রঞ্জিত ঠাকুর বলেন,“ইলিশের প্রজনন মৌসুমে যেমন জেলেদের সরকারিভাবে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়, তেমনি শীতকালে নরসুন্দর পেশায় জড়িত হতদরিদ্র মানুষদের জন্য খাদ্য সহায়তা বা বিশেষ প্রণোদনা চালু করা হলে হাজারো পরিবার বাঁচবে।
এ বিষয়ে নীলফামারী জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মনোয়ারুল ইসলাম মুঠোফোনে বলেন, “খুব শিগগিরই উপজেলাগুলোতে সরকারিভাবে পাওয়া শীতবস্ত্র পাঠানো হবে। দুঃস্থ ও অসহায় পরিবারগুলোর মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ করা হবে।
তবে নরসুন্দরদের দাবি, শুধু শীতবস্ত্র যথেষ্ট নয়। দীর্ঘ শীতকালজুড়ে কর্মহীন সময়ে খাদ্য সহায়তা, নগদ প্রণোদনা বা বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হলে এই পেশার মানুষগুলো মানবেতর জীবন থেকে রক্ষা পাবে।